Thursday, October 20, 2016

গল্প নয় সত্যি...

গল্পটা ২০০৮ সালের। কোন এক মফস্বল শহরের। শহরের সব চাইতে দুষ্টু বন্ধুদের একটি দলের একটি সাধারন ছেলের গল্প এটা। ছেলেটা একটা মেয়েকে ভালোবাসতো। ছেলেটা তখন সবে মাত্র কলেজে যখন মেয়েটা স্কুলে। প্রতিদিন মেয়েটাকে দেখার জন্য তার বাড়ীর সামনে দাড়িয়ে থাকতো। তারপর ৫ ঘন্টা স্কুলের সামনে। ছুটির পরেও সেই মুখটা দেখে তবে বাড়ি ফেরা। আবার পরের দিন। সেই সকাল থেকে বিকাল, আবার সন্ধ্যা থেকে রাত ১২ টা। ছেলেটার পৃথিবীটাই সেই মেয়ের চারপাশে ঘুরছিলো। আস্তে আস্তে মেয়েটাও সাড়া দিতে লাগলো। ছেলেটা দুর থেকে তার বন্ধুদের সময় বলে দিতো মেয়েটাকে উদ্দ্যেশ্য করে। মেয়েটাও ঠিক সেই সময় বাসার সামনে এসে দাড়াতো। এভাবে দিনের পর দিন। চলতেই থাকলো। মেয়েটা প্রতিদিন ছেলেটার বলে দেয়া সময়ে বেড়িয়ে দেখা দিতো। দুর থেকে এক ঝলক দেখা... অন্যরকম এক অনুভুতি।

সব ঠিক চলছিলো, ছেলেটা ভাবলো এবার প্রপোজ করে দেই। পরের দিন খুব সকালে স্কুলের সামনে দাড়িয়ে ছিলো হাতে একুট ফুল আর বৈশাখী কার্ড নিয়ে। কিন্তু কেমন জানি সব গড়মিল হয়ে গেল। মেয়েটা পাত্তাই দিলো না সেদিন। পরের দিন থেকে তার পিসিকে নিয়ে স্কুলে গেল। ছেলেটা তার জায়গাতেই বসে ছিলো যেখানে বসে মেয়েটাকে প্রতিদিন দেখে। তখনই মেয়েটা তার পিসিকে ছেলেটাকে দেখিয়ে দিলো। ব্যাস। বাসায় তোলপাড়। এভাবে কয়েকদিন বাসা থেকে লোক যেত। কিছুদিন পর ছেলেটা আবার সেই আগের নিয়মে মেয়েটার কানে সময় জানিয়ে দিতো। অবাক করার বিষয় ,, মেয়েটা আবার ছেলেটার দেয়া সময়ে বের হতো। বাসার সামনে হাটাহাটি করতো যেন ছেলেটা তাকে দেখতে পারে। আবার সেই সুন্দর মুহুর্ত 🙂 তার কিছুদিন পর মেয়েটা তার বাবাকে দেখিয়ে দিলো সেই ছেলেটাকে। মেয়েটার বাবা সেই ছেলেটাকে একটু শাসন করে দিলেন। ছেলেটার মন ভেঙ্গে গেল। সে মেয়েটার জীবন থেকে সরে যেতে লাগলো।
----
----
৩ মাস পর ছেলেটা আবার মেয়েটাকে দেখলো। ব্যাস,,,, আবার শুরু.. সেই আগের নিয়মেই... দুর থেকে সময় জানিয়ে দেয়া ... সময়মতো বাসার সামনে আসা। সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত মেয়টার আশেপাশে থাকা। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কিছুই গায়ে লাগতো না। ছুটির দিনে মেয়টাকে দেখার জন্য কড়া রোদে পুড়ে একটা পুলের উপরে ঘন্টার পর ঘন্টাও বসে থাকতো। মেয়েটাও ছাদে উঠতো.... এক নজর দেখা দিয়ে নেমে যেত। এর কিছুদিন পর আবার মেয়েটা তার বাবাকে নাশিশ করলো ছেলেটার নামে। এবার তার বাবা মহল্লার সব নামী ব্যাক্তিদের নিয়ে ছেলেটাকে অনেক অপমান করলেন। ছেলেটা এবার সরে গেল। আবার ব্যাস্ত হয়ে গেল ছাত্র রাজনীতিতে। ১ বছর পর খোদা নতুন মোড় দিলেন এই গল্পের। ছেলেটা আবার নতুন করে ভাবতে লাগলো। এবার মেয়েটার মায়ের নাম্বার জোগার করে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করতো। একদিন হয়েও গেল দুজনের কথা। প্রথম কথা। মেয়েটা পাত্তা না দিলেও কিছুদিন পর ঠিক নিজে থেকেই যোগাযোগ করতো। এবার ছেলেটা সম্পূর্ন তৈরী ছিলো, তাদের চির প্রতিক্ষীত সেই সম্পর্কটাকে পূর্নতা দেবার। কিন্তু মেয়েটা আবার যোগাযোগ বন্ধ করে দেলো। স্কুল ছুটি ছিলো। তাই দেখার মতো উপায় নেই। তাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেয়েটার বাসার সামনেই বসে থাকতো পাগলটা। কিন্তু না,,, দেখাও পেল না। তারপর স্কুল খুললো। একদিনরে জন্য। সেদিনের পর একমাসের ছুটি। ছেলেটা আজ তৈরী। আজ প্রপোজ করবেই। দুই বছর হয়ে গেছে আর কতো? রাতে অনেক রকম প্রস্তুতি নিয়ে রাখলো। মাঝ রাতে ফোন এলো। ছেলেটার বাবা হাসপাতালে। স্ট্রোক করেছেন। এতো রাতে যাবার কোনও উপায় নেই। অারকাল সকালে প্রপোজ না করলে যে আরও একমাস দেখাই পাবেনা মেয়েটার। তাই খুব সকালেই সে স্কুলের সামনে হাজির হলো। ফুলটা হাতে দিয়েই দৌড়ে চলে যাবে স্টেশনে। হাতে সময় নেই। বাবা হাসপাতালে। কিছুক্ষন পরেই একটা ফোন আসলো। ব্যাস্। ছেলেটার জীবনের মানচিত্র সম্পূর্ন বদলে গেল। তার বাবার হাতে হয়তো সময় ছিলো না। তাই হাজার চেষ্টা করেও ছেলেকে শেষ দেখা দেখতে পারলেন না। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সেদিন ফুলটা সেই ব্রীজের গোড়াতেই পড়ে ছিলো যেখানে বসে ছেলেটা মেয়েটাকে দেখতো।
----
----
তার ছয় মাস পরের কথা। একদিন হঠাৎ মেয়েটা ফোন দিলো তার এক দিদির নাম্বার থেকে। ছেলেটা তখন জীবনের সাথে চরম যুদ্ধ করছে। একদিকে পরিবার, অন্যদিকে নতুন জায়গা। এমন এক জীবন যা সে কখনো কল্পনা করেনি। রাজপূত্রে মতো মানুষ হওয়া ছেলেটা বাস্তবতার চরম আঘাতে প্রতিদিন তিলে তিলে মরতে লাগলো। তবে এক মুহুর্তের জন্য সেই তার পাগলীর কথা ভুলেনি। আবার পাগলী ফিরেও এসেছে। তার গন্তব্যে। শুরু হলো নতুন অধ্যায়। এবার যেন নতুন রুপ ! সকাল থেকে রাত পর্যন্ত,, তারপর সারারাত দুজনের মিষ্টি গল্প। কথা যেন ফুরোতেই চায় না। এবার মেয়েটা প্রমান করতে লাগলো যে সে সত্যি তাকে ভালোবাসে। ছেলেটা আবার পথ হারাতে লাগলো। এখন যে তার নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার সময়! আর এখনই সে প্রেমে মগ্ন। তবে তার বিশ্বাস ছিলো মেয়েটা তাকে ধরে রাখবে। আর হারিয়ে যাবে না। এভাবে ৩টা বছর দুজন একসাথে কাটিয়ে দিলো। এর মাঝেও হাজার বাধা-বিপত্তি,, অনেক আঘাত তাদের আলাদা করে দিয়েছিলো। তবে সেটা বেশিদিনের জন্য না। মেয়েটা ঠিক বার বার ফিরে আসতো। আবার শুরু। হঠাৎ থামা। ফের শুরু। এভাবে চলতে চলতে একদিন হঠাৎ থেমে গেল তাদের ৫ বছরের গল্পটা। হাজার আকুতি-অনুরোধ, কিছুতেই মেয়েটাকে কাছে রাখতে পারছে না ছেলেটা। সে চলে যাবেই। সে নিজের পরিবারের কথার বাইরে যাবে না। ছেলেটাকে হাজার স্বপ্নে বিভোর করে ঘুম পাড়িয়ে চলে গেল নিজের ঠিকানায়। আর পেছনে তাকিয়ে দেখলো না। কি করছে তার সেই পাগলটা। কিভাবে আছে, কিভাবে বাঁচে? না। সে দেখলো না। সে দেখছে না। সে আর দেখবে না।
----
----
আজ ৩ বছর পার হয়ে গেছে। ছেলেটা তার পাগলীকে দেয়া সব ওয়াদা পূরন করেছে। সে নিজের পায়ে দাড়িয়েছে। সে তার চাহিদার চাইতে বেশি আয় করে। পাগলী যেভাবে বলেছিলো সে আজ সেভাবেই নিজেকে নিয়ে এসেছে। প্রতি মুহুর্তে সে তার পাগলীটার খবর নেয়। পাগলী কি করে, কোথায় যাচ্ছে, কেমন আছে 🙂 এটুকুই তার জন্য যথেস্ট। যখন খুব খারাপ লাগে, সেই পুরনো শহরে গিয়ে দুর থেকে দেখে আসে পাগলীটাকে। একনজর। পাগলী জানতেও পারে না যে তার আশে পাশে আজও সেই পাগলটার অস্তিত্ব রয়ে গেছে। আট বছরের সেই অসম্পূর্ন গল্পটা আরও ৮০ বছর বয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা আছে পাগলটার। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত। আজ তার সব আছে। সব। শুধু পাগলীটা নেই। আর সে জানে, পাগলীটা আর ফিরবেও না.....

No comments:

Post a Comment

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...